উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ ও প্রতিকার । উচ্চ রক্তচাপ কমানোর ঘরোয়া উপায় ২০২২

উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ ও প্রতিকার । উচ্চ রক্তচাপ কমানোর ঘরোয়া উপায় ২০২২: সাধারণত উচ্চ রক্তচাপের সাধারণত কোনো লক্ষণ থাকে না, রোগীর কোনো শারীরিক কষ্ট থাকে না। তাই এজন্য এ রোগে কেউ ভুগছেন কিনা সেটা তিনি নিজে বুঝতে পারেন না। যখন উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা যেমন- স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, কিডনি নষ্ট হওয়া এর কোনোটি হয় তখন রোগীর বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। তাই এ রোগ নির্ণয় করাই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। 

আবার যদি কারও উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় হয়, তবে প্রায় অর্ধেক রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নেন না। উচ্চ রক্তচাপ রোগীর ১ থেকে ৩ মাস পরপর কোনো সমস্যা না থাকলেও ফলোআপে থাকতে হয়, চেক করতে হয় যে প্রেসার নিয়ন্ত্রণে আছে নাকি নেই। এছাড়া রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসার পরও ওষুধ সারাজীবনের জন্য খেতে হয়।

উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ 

  • প্রচণ্ড মাথাব্যথা
  • মাথা গরম হয়ে যাওয়া এবং মাথা ঘোরানো
  • ঘাড় ব্যথা
  • বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
  • অল্পতেই রেগে যাওয়া বা অস্থির হয়ে শরীর কাঁপতে থাকা
  • রাতে ভালো ঘুম না হওয়া
  • মাঝে মধ্যে কানে শব্দ হওয়া
  • অনেক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলা

উচ্চ রক্তচাপ কী?

হৃৎপিণ্ডের ধমনীতে রক্ত প্রবাহের চাপ অনেক বেশি থাকলে সেটিকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেশার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

দু'টি মানের মাধ্যমে এই রক্তচাপ রেকর্ড করা হয় - যেটার সংখ্যা বেশি সেটাকে বলা হয় সিস্টোলিক প্রেশারআর যেটার সংখ্যা কম সেটা ডায়াস্টলিক প্রেশার।

উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ ও প্রতিকার । উচ্চ রক্তচাপ কমানোর ঘরোয়া উপায় ২০২২

কী কারণে উচ্চ রক্তচাপ হয়?

৯০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না, একে প্রাইমারি বা অ্যাসেনশিয়াল রক্তচাপ বলে। সাধারণত বয়ষ্ক মানুষের উচ্চ রক্তচাপ বেশি হয়ে থাকে। কিছু কিছু বিষয় উচ্চ রক্তচাপের আশঙ্কা বাড়ায়; যেমন উচ্চ রক্তচাপের বংশগত ধারাবাহিকতা আছে, যদি মা-বাবার উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তবে সন্তানেরও এই রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমনকি নিকটাত্মীয়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও অন্যদের এর ঝুঁকি থাকে। তবে গবেষণায় উচ্চ রক্তচাপের কমন কিছু কারণ উঠে এসেছে।

অধিক ওজন ও জীবনযাত্রা: যথেষ্ট পরিমাণে ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম না করলে শরীরের ওজন বেড়ে যেতে পারে। এতে হৃদযন্ত্রে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। অধিক ওজনসম্পন্ন লোকদের উচ্চ রক্তচাপ হয়ে থাকে।

আরো পড়ুন:  জন্ম নিবন্ধন যাচাই | জন্ম নিবন্ধন যাচাই কপি ডাউনলোড | bdris.gov.bd

ধূমপান: ধূমপায়ী ব্যক্তির শরীরে তামাকের নানা রকম বিষাক্ত পদার্থের প্রতিক্রিয়ায় উচ্চ রক্তচাপসহ ধমনি, শিরার নানা রকম রোগ ও হৃদরোগ দেখা দিতে পারে।

অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ: খাবার লবণে সোডিয়াম থাকে, যা রক্তের জলীয় অংশ বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তের আয়তন ও চাপ বেড়ে যায়।

খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার যেমন- মাংস, মাখন ও ডুবো তেলে ভাজা খাবার খেলে ওজন বাড়ে। ডিমের হলুদ অংশ এবং কলিজা, গুরদা, মগজ এসব খেলে রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যায়। রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল হলে রক্তনালির দেয়াল মোটা ও শক্ত হয়ে যায়। ফলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।

ডায়াবেটিস: বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিসের রোগীদের উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়। এ ছাড়া তাদের অন্ধত্ব ও কিডনির নানা রকম রোগ হতে পারে।

অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা: অতিরিক্ত রাগ, উত্তেজনা, ভীতি এবং মানসিক চাপের কারণেও রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। যদি এই মানসিক চাপ অব্যাহত থাকে এবং রোগী ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারেন, তবে এই উচ্চ রক্তচাপ স্থায়ী রূপ নিতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ কমানোর ঘরোয়া উপায়

অতিরিক্ত লবণ খাওয়া বাদ দিতে হবে, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস করতে হবে, নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে, সিগারেট ছাড়তে হবে। আর দুশ্চিন্তা যত কম করা যায় ততই ভালো। ডায়াবেটিস কন্ট্রোলে রাখতে হবে। রক্তের কোলেস্টেরল যাতে না বাড়ে, সেজন্য ডিম, মাখন, পনির, খাসির মাংস, গরুর মাংস এসব থেকে দূরে থাকতে হবে। শরীরে মেদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই ওজন কমানো দরকার। আসল যে কাজটি করতে হবে, তা হলো নিয়মিত ওষুধ খাওয়া। আপনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, হাইপারটেনশনও আপনার সঙ্গে থাকবে। সুযোগ পেলেই তা আপনাকে আঘাত করবে। নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে এবং চেকআপ করাতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে লবণ কম খান

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে কাঁচা লবণ খাওয়া যাবে না। আর রান্নাতেও যতটা সম্ভব লবণ কম দিন। অতিরিক্ত লবণ রক্তে মিশে সোডিয়ামের মাত্রা বাড়ায় এবং দেহে সোডিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট করে। ফলে রক্তচাপ হু হু করে বাড়তে থাকে। কিডনির উপরেও এর যথেষ্ট প্রভাব পড়ে।

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে ফেলুন

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে অতিরিক্ত ওজন কমাতে হবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলে উচ্চ রক্তচাপ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে নিয়মিত ব্যায়াম

প্রতিদিন ৩০ মিনিট ব্যায়াম রক্তচাপ কমিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ব্যায়ামের সময় হৃদপিণ্ড শক্ত হয় এবং পাম্প করতে চাপ কম লাগে। যা আর্টারি প্রেশার কমিয়ে উচ্চ রক্তচাপ কমায়।

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে চর্বি জাতীয় খাবার পরিহার করুন

উচ্চ রক্তচাপ কমানোর জন্য চর্বি জাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে। তবে শুধু খাবারের কোলেস্টেরলই রক্তে কোলেস্টেরল বাড়ানোর জন্য দায়ী নয়।  সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার যেমন- মাখনচর্বিযুক্ত গরুর মাংস ও খাসির মাংসের পরিবর্তে অসম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার যেমন- সয়াবিন তেলসূর্যমুখী তেলজলপাইয়ের তেলমাছ পর্যাপ্ত খাওয়া উচিত।

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান

সবজি এবং ফলমূল শরীরের জন্য উপকারী। এগুলো রক্তে কোলেস্টেরলও কমায়। দ্রবণীয় আঁশ পরিপাক নালি থেকে স্পঞ্জের মতো কোলেস্টেরল শুষে নেয়।  শিমবার্লিতে প্রচুর আঁশ থাকে।

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে মদ্যপান পরিহার করুন

অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় পান শরীরের জন্য ক্ষতিকারক।  মদ সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে ধূমপান পরিহার করুন

ধূমপান করলে রক্তে উপকারী কোলেস্টেরল বা বেশি ঘনত্বের কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমে যায়।  রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে অবশ্যই ধূমপান ছেড়ে দিতে হবে।

 

তাৎক্ষনিক উচ্চ রক্তচাপ কমানোর ঔষধ

  • হাইডোক্লোরোথিয়াজাইড (এইচসিটিজেড) বা অন্য মূত্রবর্ধক ('জলের বড়ি')এ্যমলোডিপিন বা অন্য ক্যালসিয়াম চ্যানেল রোধক (এগুলোর নামগুলো প্রায়শই -ডিপিন দিয়ে শেষ হয়)
  • ক্যাপটোপ্রিল, এনালাপ্রিল, বা অন্যান্য এসিই রোধক (এগুলোর নাম প্রায়শই -প্রিল দিয়ে শেষ হয়)
  • লোসারটেন বা অন্যান্য এআরবি (এগুলোর নাম প্রায়শই -সারটেন দিয়ে শেষ হয়)এ্যটেনোলোল বা অন্যান্য বেটা রোধক (এগুলোর নাম প্রায়শই -লোল দিয়ে শেষ হয়)। উচ্চ রক্ত চাপের চিকিৎসা করতে যখন বেটা রোধক ব্যবহার করা হয় তখন সেগুলো অন্যান্য ঔষধের সাথে যৌথ ভাবে ব্যবহার করা হয়।
”বি:দ্র: কোনো ঔষধ ব্যবহারের পূর্বে ডাক্তারের পরামর্শ নিন”

আরো পড়ুন: সম্পর্কে ঘন ঘন ঝগড়া? দাম্পত্য জীবনে সুখি হওয়ার উপায়

তেঁতুল কিংবা লেবু কী উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে

  • অনেকেই উচ্চরক্তচাপ হলে তেঁতুলের পানি বা লেবুর রস খান। এটি একটি প্রমাণহীন ধারণামাত্র। তেঁতুলের পানি বা লেবুর রস পান করলে উচ্চরক্তচাপ কমে আসে বা নিয়ন্ত্রণে আসে তা ভিত্তিহীন ধারণা। আবার লেবুর রস খেলে রক্তের চর্বি কেটে যায়, এটাও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়।
  • বরং তেঁতুলের পানি বা লেবুর রস একটু বেশি পান করলেই গলাজ্বলা, বুকজ্বলা ও টক ঢেঁকুর ওঠে। তখন রোগী আরও ঘাবড়ে গিয়ে ধারণা করতে পারেন যে এটা হার্টের ব্যথা কি না? তাই যাদের উচ্চরক্তচাপ আছে তাদের এসবে কান না দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিত।
  • আবার অনেকেরই ধারণা, দুর্বল বা অসুস্থ লাগলে শিরায় দু-এক ব্যাগ স্যালাইন দেওয়া হলেই সুস্থ ও সবল লাগবে। আসলে ধারণাটি ঠিক নয়। বিভিন্ন ধরনের স্যালাইনে বিভিন্ন অনুপাতে লবণ ও গ্লুকোজের মিশ্রণ রয়েছে এবং বিভিন্ন ধরনের স্যালাইন ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট কিছু কারণও আছে।
  • বিনা কারণে স্যালাইন দেওয়া হলে বরং হিতেবিপরীত হতে পারে। যেমন : অকারণে রক্তে লবণ বেড়ে যেতে পারে, উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগীর রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, এমনকি না বুঝে কিডনি ও হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বেশি স্যালাইন দেওয়া হলে জীবনসংকট দেখা দিতে পারে। তাই কারণ ব্যতীত ও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া শিরায় স্যালাইন দেওয়া উচিত নয়। তাই এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

পরামর্শদাতা : অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

Next Post Previous Post
2 Comments
  • Evan Khan
    Evan Khan May 31, 2022 at 2:17 PM

    Nice

  • Md Abdullah
    Md Abdullah July 6, 2022 at 7:21 PM

    অনেক সুন্দর পোস্ট ধন্যবাদ

Add Comment
comment url