বাংলাদেশের সকল যৌনপল্লির তালিকা ও পতিতালয়ের ইতিহাস

যৌনপল্লি বা পতিতালয় একটি জায়গা যেখানে মানুষ টাকার বিনিময়ে কোনো যৌনকর্মীর সাথে যৌন সঙ্গমের উদ্দেশ্যে আসে। অন্ন সংস্থানের জন্য টাকার বিনিময়ে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অন্যকে যৌনতৃপ্তি যারা দেয় তাদেরকে আমরা যৌনকর্মী বলে থাকি। সাধারণত যে স্থানে যৌনর্মীদের অবস্থান সে স্থানকেই যৌনপল্লি বলা হয়। প্রত্যেক যৌনকর্মীকেই কোন না কোন সর্দারনী বা বাড়িওয়ালীর তত্বাবধানে থাকতে হয়। এসব সর্দারনীর দায়িত্বে থেকে ৫০ জন করে যৌনকর্মী থাকে। অনেক দেশের আইনে যৌনপল্লি বৈধ আবার অনেক দেশের আইনে এটি অবৈধ বা নিয়ন্ত্রিত। যেখানে পেশাদার যৌনকর্ম বা যৌনপল্লি নিষিদ্ধ সেখানে বিভিন্ন ব্যবসা যেমন ম্যাসেজ পার্লার, বার ইত্যাদির আড়ালে পেশাদার যৌনকর্ম চলে।

বাংলাদেশের সকল পতিতালয়ের ইতিহাস ও যৌনপল্লির তালিকা

জেলা ভিত্তিতে যৌনপল্লির তালিকা

বাংলাদেশের সকল জেলার পতিতালয়ের তালিকা ২০২২: বাংলাদেশে পেশাদার যৌনকর্ম আইন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হলেও বৈধ, যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশসমূহের মধ্যে বিরল। আইন অনুসারে কেবল প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা আদালতে ঘোষণা দিয়ে পেশাদার যৌনকর্মে নিয়োজিত হতে পারেন, যদিও বাংলাদেশে লক্ষাধিক যৌনকর্মীর মধ্যে বিপুল সংখ্যক শিশুও রয়েছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশে ১৪টি নিবন্ধিত যৌনপল্লি ছিলো।

কুমিল্লা জেলা যৌনপল্লি

কুমিল্লা শহরের ছোট যৌনপল্লির পাশাপশি দাউদকান্দির গৌরিপুর বাজারের পাশে আরেকটি যৌনপল্লি স্থাপন করা হয়েছিল।

চট্টগ্রাম জেলা যৌনপল্লি

কর্ণফুলী নদী তীরে প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো চট্টগ্রামের সাহেবপাড়ার যৌনপল্লি। এককালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের যৌনপল্লি ছিল বর্তমান রিয়াজউদ্দীন বাজার এলাকায়, বাজারটি প্রতিষ্ঠিত হবার। দেড় থেকে দুই হাজার যৌনকর্মী ছিলেন সেখানে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ভিড়লেই নাবিকেরা জাহাজ থেকে নেমে খোঁজ করতেন যৌনপল্লিটির। পাকিস্তানি আমলে উচ্ছেদ হওয়া যৌনপল্লিটি পরবর্তীতে বন্দরের কাছে মাঝির ঘাটে পুনঃস্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য সেটাও উচ্ছেদ করা হয়েছে।

যশোর জেলা যৌনপল্লি

যশোর শহরে যৌনপল্লির ইতিহাস ৫০০ বছরের পুরনো। মোগল সম্রাট আকবর-এর সময় থেকেই যৌনপল্লি ছিলো জমজমাট। ব্রিটিশ যুগে সেখানে তিনটি যৌনপল্লি ছিলো। কলকাতা থেকে নিয়মিত জমিদার মন্মথনাথ রায় যেতেন ফূর্তি করতে। জানা যায় তার জন্যে যৌনকর্মী যেতো চাঁচড়ার রায় পাড়ার ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে। বর্তমানে যশোর শহরে ঝালাইপট্টি মারওয়াড়ি মন্দির এলাকায় দুটি যৌনপল্লিতে প্রায় ১২০জন যৌনকর্মী আছেন।

যশোর জেলা যৌনপল্লি

খুলনা জেলা যৌনপল্লি

খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা যৌনপল্লিতে রয়েছেন প্রায় ৯০ জন যৌনকর্মী। তাছাড়াও ২০২০ সালে এখানে থাকতেন ৬৫ জন শিশু ৭০ জন পুরুষ। একশবছরের বেশি আগে মোংলা সমুদ্রবন্দর এর কাছে পশুর নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যৌনপল্লিটি। ২০১৯ সালে যৌনপল্লিতে অবস্থানরত ৫০ শিশুকে স্কুলগামী করতে তাদের জামাকাপড়, শিক্ষা উপকরণ প্রতি মাসে নগদ অর্থ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। বানিশান্তা ঢাংমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যৌনপল্লির মায়েদের সমাবেশে হয়েছে শিক্ষা অফিসের উদ্যোগে। ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্পান-এর আঘাতে যৌনপল্লির অধিকাংশ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে যায়।

বাগেরহাট জেলা যৌনপল্লি

বাগেরহাট শহরে ঘোষপট্টির কাছের যৌনপল্লিতে থাকেন প্রায় ৪০ জন যৌনকর্মী। ২০২০ সালেে এখানে আরো ছিলেন তাদের ৪৪ জন সন্তান।

ঢাকা জেলা যৌনপল্লি

ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে যৌনপল্লির মধ্যে গঙ্গাজলি সাঁচিবন্দর ছিল বিখ্যাত।ইসলামপুর  পাটুয়াটুলীর মোড় থেকে ওয়াইজঘাট নামে যে পথটি বুড়িগঙ্গার দিকে চলে গেছে তার নাম একসময়ে ছিল গঙ্গাজলি। নাট্যকার সাঈদ আহমেদ লিখেছেন যে মহেশ ভট্টাচার্যের হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকানের কাছে  কালীমন্দিরের উল্টোদিকে গঙ্গাজলি ছিল দোতলা প্রশস্ত বাড়ি। নিচতলায় থাকতেন বাইজিদের কাজের লোকেরা। বাইজিরা থাকতেন বাঁকওয়ালা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায়। বাইজিদের খাস কামরা সাজানো থাকত শানশওকতে। তাতে ছিলো ফরাশ বিছানো ঘর আর বারান্দায় পাতা থাকত ইজিচেয়ার। গঙ্গাজলির অধিকাংশ বাইজি ছিলেন বৈষ্ণব। প্রতিদিন সকালে দলবেঁধে বুড়িগঙ্গায় স্নান সেরে তাদের বুকে গামছা জড়িয়ে কোমরে পিতলের কলসি নিয়ে সিক্তবসনে দলবেঁধে দিয়ে ফিরে আসার বর্ণনা দিয়েছেন সাঈদ আহমেদ এবং শিল্পী পরিতোষ সেন ১৯৮০ সাল থেকে ঢাকার কুমারটুলি, গঙ্গাজলি পাটুয়াটুলি যৌনপল্লি উচ্ছেদ করা হয়েছে। ঢাকা শহরে কান্দুপট্টি ইংলিশ রোডেও যৌনপল্লি ছিল।

নারায়ণগঞ্জ জেলা যৌনপল্লি

নৌবন্দর নারায়ণগঞ্জে টানবাজারে ছিল বড় একটি যৌনপল্লি। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান টানবাজার থেকে যৌনকর্মীদের উচ্ছেদ করল তারা ছড়িয়ে পড়েন শহরের রাস্তায় রাস্তায়। আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলেন তারা। প্রায় ২০০ বছরের পুরানো এই যৌনপল্লিটি ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের নিমতলা যৌনপল্লিও এইকই সময়ে উচ্ছেদ করা হয়।

১৯৮৫ সালে টানবাজার যৌনপল্লির দৌলত খান ভবনে নরসিংদীর এক গ্রামের ১২-১৩ বছরের মেয়ে শবমেহেরকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করতে মারধর বৈদ্যুতিক শক দিয়ে অত্যাচার করে মৃতপ্রায় অবস্থায় টানবাজারের বাইরে রাস্তায় ফেলে রেখেছিলেন অভিযুক্ত মালিক মমতাজ মিয়া এবং দালাল সর্দারনি। তাকে রাস্তার মানুষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ- নিয়ে যাবার পর সেখানে ৩৫ নং ওয়ার্ডে তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি সাড়া মানুষের মধ্যে সাড়া জাগায়। তার মৃত্যু নিয়ে লেখক ইমদাদুল হক মিলন টোপ উপন্যাস লেখেন, এবং কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর লেখা গানে কণ্ঠ দেন শিল্পী ফকির আলমগীর জাহানারা আরজুর কবিতা শবমেহের তোমার জন্যঅবলম্বনে শবমেহের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান করেন ইসমাইল হোসেন।

রাজবাড়ি জেলা যৌনপল্লি

রাজবাড়ি জেলা যৌনপল্লি

দৌলতদিয়া ঘাটের যৌনপল্লিটি দেশের মধ্যে বৃহত্তম এবং এবং দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম যৌনপল্লি। এটি পৃথিবীর বড় কয়েকটি পতিতালয়ের মধ্যে একটি। বিপুল সংখ্যক নারী শিশু সেখানে প্রতিদিন প্রায় হাজার খদ্দেরকে খুশি করতে ব্যবহৃত হন। এখানে প্রায় ,৫০০ জন নিবন্ধিত যৌনকর্মী রয়েছেন। ১৯৮৮ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত বলা হলেও দৌলতদিয়ায় বহুকাল আগে থেকেই পেশাদার যৌনকর্মের প্রচলন ছিলো।

ফরিদপুর জেলা যৌনপল্লি

ফরিদপুর শহরের হাজী শরিয়তুল্লাহ বাজার সংলগ্ন রথখোলা যৌনপল্লি এবং ডিক্রীরচর ইউনিয়ন-এর সিএন্ডবি ঘাট যৌনপল্লিতে সরকারি হিসাবে প্রায় ৩০০ যৌনকর্মী রয়েছেন। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যাটি দ্বিগুনও হতে পারে।


টাঙ্গাইল জেলা যৌনপল্লি

টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর বাজারে একসময়ে ছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ বাইজিপল্লি। রসিকরা সেখানে শুধু কামপ্রবৃত্তি নয়, গুণী বাইজির গান নাচের আসর উপভোগের জন্য যেতেন।

বর্তমানে টাঙ্গাইল শহরের কান্দাপাড়া যৌনপল্লি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম যৌনপল্লি। একবার উচ্ছেদ হওয়া টাঙ্গাইল যৌনপল্লি পুনরায় চালু করার আন্দোলন হয়েছে। পুনরায় চালু হবার পর এখানে ৮০০জন নিবন্ধিত যৌনকর্মী রয়েছেন, যাদের অনেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে লক্ষ্য করা যায়। টাঙ্গাইলের যৌনপল্লিটি প্রথম দেখায় একটি সাধারণ বস্তি মনে হয়। মোটা লাঠি নিয়ে যৌনপল্লিটি পাহারা দেয়া হয়। যৌনপল্লির খোলা নর্দমা পরিত্যক্ত কন্ডমে আটকে গেছে।

ময়মনসিংহ জেলা যৌনপল্লি

ময়মনসিংহের গাঙ্গিনাপাড়ে ব্রিটিশ আমলের পুরোনো যৌনপল্লিটিতে প্রায় ৩০০ যৌনকর্মী আছেন। তা ছাড়াও ২০২০ সালে গাঙ্গিনাপাড় যৌনপল্লিতে সরকারী ব্যক্তিমালিকানাসহ ১০টি বাড়িতে যৌনকর্মীদের পরিবারের সদস্যসহ প্রায় এক হাজার মানুষ বসবাস করেন।

জামালপুর জেলা যৌনপল্লি

জামালপুরের রাণীগঞ্জ যৌনপল্লিতে ২০২০ সালে সরকারি হিসেবে ৯৭ জন সক্রিয় যৌনকর্মী, ৫০ জন বৃদ্ধা জন পাহারাদার ছিলেন। বেসরকারি হিসেবে ছিলেন দুশতাধিক যৌনকর্মী। পল্লির নয়টি বাড়িতে ১৭৪টি ঘর রয়েছে যার প্রতিটিতে থাকেন একজন করে যৌনকর্মী।

পটুয়াখালী জেলা যৌনপল্লি

পটুয়াখালীর যৌনপল্লিতে প্রায় ২০০ ঘর আছে। ২০২০ সালে সেখানে ১৩০জন যৌনকর্মী এবং মাসি শিশুসহ মোট ২০০ লোকের বসবাস ছিলো।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url